মানিকগঞ্জের নদীপাড়ের মাইনষের কাছে নদী শুধু পানির ধারা না, নদী অইল তাগোর জীবন, জীবিকা আর নিয়তির এ্যাকটা অংশ। কুনো সময় নদীর বুকে নতুন চর জাইগ্যা ওঠে, হেইখানে গইড়া ওঠে বসতি আর ফসলের মাঠ। আবার কুনো সময় হেই নদীই ভাঙন ধইরা কাইড়া নেয় ঘরবাড়ি, জমিজমা, গাছপালা আর বহু বছরের স্মৃতি। তাই চরবাসীর জীবন যেন এক অদ্ভুত চক্রের মইধ্যে বান্ধা। আইজ যেখানে মাটি, কাইল হেইখানে পানি। আবার কোনো একদিন হেই পানির বুকেই নতুন মাটি মাথা তুইলা খাঁড়ায়।
মানিকগঞ্জের ভূপ্রকৃতিই এমন। জেলার পশ্চিম আর দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তজুড়ে পদ্মা, আর উত্তরের দিকে যমুনাসহ গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদী বইয়া গেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জেলার প্রধান নদ-নদীর মইধ্যে পদ্মা, যমুনা, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা আর ইছামতি আছে। নদীবাহিত পলিতে গইড়া উঠছে জেলার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড।
এই নদীঘেরা জীবনের সবচেয়ে পরিষ্কার ছবি দ্যাখা যায় হরিরামপুর আর দৌলতপুরের চরাঞ্চলে। হরিরামপুরের পদ্মাতীরের কয়েকটা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা আগেও নদীর গর্ভে বিলীন অইছে। পরে নদীর গতিপথ বদলাইলে হেই এলাকাগুলার কিছু অংশ আবার চর হইয়া জাইগ্যা উঠছে। মানে, যে জমি একসময় হাইরা গেছিল, নদীর বুকেই কোনো কোনো জায়গায় হেই জমির নতুন রূপ আবার ফিরা আইছে।
চর জাইগ্যা উঠলে মাইনষের চোখে সম্ভাবনার আলো দ্যাখা যায়। নতুন জমিতে চাষাবাদ শুরু অয়, গইড়া ওঠে বসতি। কুনো জায়গায় ভুট্টা, সরিষা, ডাল কিংবা বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের আবাদ অয়। সাটুরিয়ার সরকারি কৃষি তথ্যেও চরাঞ্চলে ভুট্টা, সরিষা, খেসারি, মসুর আর মরিচের মতো ফসল চাষের তথ্য আছে।
দৌলতপুরের চরাঞ্চলেও কৃষি আর নদীকেন্দ্রিক জীবন পাশাপাশি চলে। বাঘুটিয়া, বাচামারা আর চরকাটারীর মতো ইউনিয়নের কুনো কুনো এলাকায় নদীপথ এহনো যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। পদ্মা আর যমুনা হেইখানকার মৎস্যসম্পদের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাইখে।
তয় চরজীবনের এই সম্ভাবনার লগে সবসময়ই জড়াইয়া থাকে অনিশ্চয়তা। যমুনার ভাঙনে দৌলতপুরের চরাঞ্চলের মাইনষের জমিজমা আর বসতবাড়ি প্রায় প্রতি বছরই ক্ষতিগ্রস্ত অয় বইলা সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে আইছে। শুষ্ক মৌসুমে যেখানে চর জাইগ্যা ওঠে, অন্য সময় হেইখানেই ভাঙনের ভয় তৈরি অয়।
পদ্মার পাড়েও একই অবস্থা। সাম্প্রতিক বছরগুলার বিভিন্ন ঘটনায় হরিরামপুরের নদীতীরের মাইনষের বসতভিটা আর ফসলি জমি নদীর গর্ভে চইলা যাওয়ার খবর আইছে। এক ঘটনায় মাত্র কয়েক দিনের মইধ্যে এক পরিবারের দুইটা ঘর নদীতে বিলীন অইয়া যাওয়ার কথা জানাইছিলেন ভুক্তভোগী। আরেক প্রতিবেদনে এক মাসে অর্ধশতাধিক পরিবার বসতভিটা হারানোর আর বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি বিলীন অইয়া যাওয়ার তথ্য উঠে আইছিল।
নদীভাঙনের সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ে মাইনষের ঘর হারানোর মইধ্যে। একটা বাড়ি হারানো মানে শুধু কয়েকটা টিনের চাল কিংবা বেড়া হারানো না। হেই বাড়ির লগে হাইরা যায় গাছ, উঠান, পুকুর, ফসলের জমি, পারিবারিক স্মৃতি আর প্রতিবেশী সম্পর্কের একটা চেনা দুনিয়া। নদী যখন আগাইয়া আসে, তখন অনেক পরিবাররে অল্প সময়ের মইধ্যে দরকারি জিনিসপত্র নিয়া অন্য জায়গায় আশ্রয় নিতে অয়। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় হরিরামপুরে নদীভাঙনে বসতভিটা হারানো পরিবারগুলা প্রতিবেশীর ঘর কিংবা অন্যের জমিতে আশ্রয় নেওয়ার কথা জানাইছে।
চরের মাইনষের কাছে তাই ‘বাড়ি’ কতার মানেও কিছুটা আলাদা। এক জায়গায় বছরের পর বছর থাইকলেও নদী যদি হেই জায়গা কাইড়া নেয়, আবার নতুন কোনো চরে গিয়া জীবন শুরু করতে অয়। কুনো কুনো সময় হেই নতুন জায়গাটাও টেকে না। তাই ঘরবাড়ি গড়ার লগে লগেই ভাঙনের ভয়ও থাইগগ্যা যায়।
এই বাস্তবতার লগে খাপ খাইয়া নিছেন নদীপাড়ের মাইনষে। নদী যখন জমি দেয়, তাগো চাষ করে। পানি বাড়লে নৌকার ওপর ভরসা করে। ভাঙন শুরু অইলে ঘর সরানোর প্রস্তুতি নেয়। এই মানাইয়া নেওয়ার মইধ্যেই গইড়া উঠছে চরাঞ্চলের নিজস্ব জীবনধারা।
চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও নদীর প্রভাব পরিষ্কার। দৌলতপুরের চরকাটারী, বাচামারা আর বাঘুটিয়ার মতো এলাকায় নদীপথের ওপর নির্ভরতা এহনো আছে। বর্ষাকালে নৌকা অইয়া ওঠে চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। শুষ্ক মৌসুমে আবার জাইগ্যা ওঠা চর দিয়া মাইনষের চলাচলের পথ তৈরি অয়। তাই একই জায়গার যোগাযোগ ব্যবস্থাও ঋতুর লগে লগে বদলাইয়া যায়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও সবসময় এই অনিশ্চয়তার বাইরের কিছু না। নদীভাঙনে দৌলতপুরের চরকাটারী সবুজ সেনা উচ্চবিদ্যালয় নদীর গর্ভে চইলা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। হরিরামপুরেও নদীভাঙনে একটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অংশ নদীতে বিলীন অইয়া যাওয়ার খবর প্রকাশ পাইছে।
তয় নদীর লগে মাইনষের সম্পর্ক শুধু ভয় আর ক্ষতির না। নদীই তাগোর মাছ দেয়, জমিতে পলি আনে, নতুন চর তৈরি করে আর কৃষির নতুন সুযোগ তৈরি করে। নদীর বুকে জাইগ্যা ওঠা নতুন জমি অনেক পরিবারের কাছে নতুন কইরা বাঁচার সম্ভাবনা নিয়া আসে। তাই নদীরে একদিকে ভয় পায়, আবার অন্যদিকে নদীর ওপরই নির্ভর করে।
মানিকগঞ্জের চরাঞ্চলের গপ্পো আসলে বাংলাদেশের নদীমাতৃক জীবনেরই একটা ছবি। হেইখানে প্রকৃতি কুনোদিন স্থির না। নদীর গতিপথ বদলায়, চর জাগে, আবার চর ভাঙে। মাইনষের জীবনও হেই পরিবর্তনের লগে লগে নিজেগোরে মানাইয়া নেয়।
একটা চর যখন জাইগ্যা ওঠে, হেইখানে মাইনষে নতুন স্বপ্ন নিয়া ঘর বাঁধে। জমিতে বীজ পড়ে, মাঠে ফসল দোলে, পোলাপান নতুন উঠানে খেলতে শেখে। তয় নদী যখন আবার হেইর পুরান শক্তি নিয়া ফিরা আসে, তখন হেই স্বপ্নের অনেকটাই পানিতে মিইশ্যা যায়। তবু মাইনষে থাইমা থাকে না। নদীর অন্য পারে, নতুন কোনো চরে কিংবা উঁচু কোনো জমিতে আবার শুরু অয় জীবন।
চর তাই মানিকগঞ্জের মাইনষের কাছে শুধু মাটি না। চর মানে সম্ভাবনা, আবার অনিশ্চয়তাও। নদী যেমন নেয়, তেমনি দেয়। আর এই নেওয়া-দেওয়ার মইধ্যেই গইড়া উঠছে মানিকগঞ্জের নদীপাড়ের মাইনষের জীবন, সংগ্রাম আর টিইকা থাকার গপ্পো।